আলীকদম (বান্দরবান) প্রতিনিধি:
বান্দরবানের আলীকদম ও লামা বনাঞ্চলে সংরক্ষিত বন উজাড়, অবৈধ গাছ পাচার, পাহাড় কাটা এবং কাঠ চোরাকারবারিদের সঙ্গে বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশের অভিযোগে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা, পরিবেশকর্মী ও বিভিন্ন সূত্রের দাবি, বন রক্ষার দায়িত্বে থাকা কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহায়তায় দীর্ঘদিন ধরে এসব অনিয়ম সংঘটিত হয়ে আসছে।
অভিযোগ রয়েছে, আলীকদম বন বিভাগের তৈন রেঞ্জসহ কয়েকটি রেঞ্জের কিছু কর্মকর্তা ও কর্মচারী অবৈধ কাঠ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কমিশন গ্রহণের মাধ্যমে বনাঞ্চল থেকে মূল্যবান গাছ পাচারে সহায়তা করছেন। ফলে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
সূত্র জানায়, আলীকদমের সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে কয়েকশত মূল্যবান সেগুন গাছ কেটে পাচারের ঘটনায় দুর্নীতি ও দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে তৈন রেঞ্জ কর্মকর্তা জুলফিকার আলী, বিট কর্মকর্তা মোজাম্মেল এবং ফরেস্ট গার্ড আলোক সেনকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছিল।
স্থানীয়দের লিখিত অভিযোগ এবং র্যাবের অভিযানের পর বিপুল পরিমাণ চোরাই কাঠ উদ্ধার করা হয়। পরবর্তীতে তদন্তে অনিয়মের বিভিন্ন তথ্য উঠে আসে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
আলীকদমের ডিম পাহাড় ও আলীকদম-থানচি সড়কসংলগ্ন বিভিন্ন পাড়াবন এলাকায় প্রভাবশালী একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নির্বিচারে বৈলাম, গর্জন, শীল কড়ই ও গামারসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ কাটার অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তাকে মাসোহারা দিয়ে এসব গাছ কাটা হচ্ছে। এর ফলে পাহাড়ি পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ঝিরি ও প্রাকৃতিক পানির উৎস শুকিয়ে গিয়ে স্থানীয় জনগণের মধ্যে পানির সংকট দেখা দিয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, বৈধ ‘জোত পারমিট’-এর আড়ালে সরকারি বনের মূল্যবান কাঠ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাচার করা হচ্ছে। এছাড়া অবৈধভাবে কাটা কাঠের একটি বড় অংশ স্থানীয় ও আশপাশের এলাকার ইটভাটাগুলোতে জ্বালানি হিসেবে সরবরাহ করা হচ্ছে।
পরিবেশবাদীদের মতে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড শুধু বনসম্পদ ধ্বংসই করছে না, বরং পরিবেশ ও জলবায়ুর ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
ক্রমবর্ধমান অভিযোগ, জনমত ও গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর সম্প্রতি আলীকদম উপজেলা প্রশাসন ও বন বিভাগ যৌথভাবে ডিম পাহাড়সহ বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে।
অভিযানে বিপুল পরিমাণ অবৈধ গোল কাঠ ও চেরাই কাঠ জব্দ করা হয়। পাশাপাশি পাহাড় কাটার কাজে ব্যবহৃত একটি স্কেভেটর (খননযন্ত্র) অকেজো করে দেওয়া হয়। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযানে কিছু মালামাল জব্দ হলেও এ অবৈধ কর্মকাণ্ডের মূল হোতারা এখনও আইনের আওতার বাইরে রয়ে গেছে।
স্থানীয় সচেতন মহল, পরিবেশকর্মী ও বাসিন্দারা বনাঞ্চল ধ্বংস, অবৈধ কাঠ পাচার এবং পাহাড় কাটার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। তারা মনে করেন, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আলীকদম ও লামার গুরুত্বপূর্ণ বনসম্পদ এবং পরিবেশ মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে।